![]() |
| ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস |
ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস
(জন্ম: ২৮ জুন, ১৯৪০- বর্তমান) একজন সমাজসেবক, সামাজিক উদ্যোক্তা ও নোবেল পুরস্কার
বিজয়ী। ১৯৪০ সালের ২৮ জুন ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের বাথুয়া গ্রামে একটি বাঙালি মুসলিম পরিবারে
জন্মগ্রহণ করেন। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তাঁর পিতা হাজী দুলা মিয়া সওদাগর ছিলেন
একজন জহুরি, এবং তাঁর মাতা সুফিয়া খাতুন । ভাই-বোনদের
মধ্যে সবার বড়ো বোন । ড. ইউনূসের ছোটো দুভাইয়ের মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ইব্রাহিম এবং অন্যজন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
। তার শৈশব কাটে গ্রামে। বর্তমানে তিনি ২০২৪
সালের ৮ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব
পালন করছেন।
শিক্ষাজীবন : ১৯৪৫ সালে গ্রামের
প্রাইমারি স্কুল মহাজন ফকিরের স্কুলেই শুরু হয় মুহাম্মদ ইউনূসের লেখাপড়া । ১৯৪৭ সালে
তাঁকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের লামাবাজার প্রাইমারি স্কুলে । স্কুলটি
ছিল চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত । প্রাইমারি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালের মধ্যে তিনি
প্রথম হন । ক্লাস ফাইভ ও সিক্স পড়েন চট্টগ্রামের একই স্কুলে । বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে
চট্টগ্রাম রেঞ্জে প্রথম হন । বাবা চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুলে ভর্তি করাতে চাইলেও শিক্ষকদের
পরামর্শে তাঁকে ভর্তি করানো হয় চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে । ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম
কলেজিয়েট স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন । ৩৯ হাজার ছেলেমেয়েদের
মধ্যে ১৬তম স্থান অধিকার করেন। ম্যাট্রিক পাশের পর ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে । ইন্টারমিডিয়েট
পাশের পর ১৯৫৭ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে । ১৯৬১ সালে তিনি
এমএ পাশ করেন। ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভেন্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে
দেশ ত্যাগ করেন ।
শিক্ষা বহির্ভূত কর্মকাণ্ড : ম্যাট্রিক পাশের
পর কলেজ জীবনে সাহিত্য পত্রিকা বের করেন, যার নাম ‘দুপাতা’। এটি ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতি
ও রাজনীতির ‘দুপাতা’ । ‘কোহিনূর’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় ড. ইউনূস যে কলাম লিখতেন
তার নাম ছিল ‘হিং টিং ছট’ । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এনামুল হকের সাথে বের করলেন সাহিত্যপত্র
‘উত্তরণ’ । ড. ইউনূস ছিলেন ঐ পত্রিকার সহ-সম্পাদক । ১৯৫২ সালে স্কাউট আন্দোলনে অংশ
নিতে তিনি পাকিস্তান জাম্বুরিতে করাচি গমন করেন। ১৯৫৫ সালে বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরিতে
অংশগ্রহণের জন্য কানাডা গমন করেন । ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গবেষণামূলক গ্রন্থের নাম
Banker of Poor : Micro-lending and the Battle Against World Poverty, যা ১৯৯৮ সালে
প্রকাশিত হয় ।
বিবাহিত জীবন : ১৯৭০ সালে আমেরিকাতে পড়াশুনার সময় তিনি রাশিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক ভিরা ফোরোস্টোনকোকে বিয়ে করেন । ঐ ঘরে তাঁর এক মেয়ে রয়েছে, যার নাম মনিকা ইউনূস । মনিকা ইউনূসের আরও একটি বড়ো পরিচয় হলো, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত অপেরা শিল্পী । ২৬ বছর বয়সে মেট্রোপলিটান অপেরার সোপানো হওয়ার সুযোগ লাভ করেন তিনি । আমেরিকা ছাড়ার আগেই ভিরার সাথে ড. ইউনূসের বিচ্ছেদ ঘটে। দেশে ফিরে আসার পর তিনি বিয়ে করেন ড. আফরোজী ইউনূসকে। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক । এ ঘরে তাঁর একমাত্র সন্তানের নাম দীনা ইউনূস ।
কর্মজীবন : লেখাপড়া শেষ হলে কিছুদিন অধ্যাপক নূরুল ইসলাম ও রেহমান সোবহানের তত্ত্বাবধানে ব্যুরো অব ইকনমিক্সে কাজ করেন । এর মধ্যেই প্রভাষক হিসেবে চট্টগ্রাম কলেজে সরকারি চাকরি পান । ১৯৬১ সালে তিনি এ কলেজে যোগ দেন । ১৯৭০ সালের দিকে পিএইচডি করার সময় টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন । ১৯৭২ সালের জুন মাসে চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন । দেশে আসার পর অধ্যাপক নূরুল ইসলাম জোর করে তাকে পরিকল্পনা কমিশনে চাকরি দেন । কিন্তু মাস তিনেক পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন । এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু করেন শিক্ষকতা । সর্বোচ্চ বেতন দিয়ে অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক করে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তাঁকে ।
ক্ষুদ্রঋণ প্রবর্তন : বাংলাদেশ স্বাধীন
হওয়ার পরও দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না । বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের
দুর্ভিক্ষের ফলে মানুষ অনাহারে, অর্ধাহারে কষ্ট পাচ্ছিল । এই পরিস্থিতি ইউনূসের মনে
নতুন উদ্যমের সৃষ্টি করে । ইউনূস গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন যে, তিনি অর্থনীতির অভিজাত
মতবাদ শিক্ষা দিচ্ছেন অথচ মানুষের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ । তখন এ গরিব অসহায়
মানুষদের ভাগ্যোন্নয়নে তিনি দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হন । গ্রামের অসহায় লোকদের খোঁজ-খবর নিয়ে
তিনি শুরু করেন নতুন গবেষণা । তাদের জীবিকার উৎস অনুসন্ধান করেন । একদিন গ্রামে ঘুরে
দেখেন একজন দরিদ্র মহিলা সুফিয়া বাঁশের টুল বানাচ্ছে । তিনি সেই অসহায় মহিলার সাথে
কথা বলে জানতে পারেন, মহিলাটির নিজস্ব কোনো মূলধন নেই । এ কারণে তার উপার্জনের ৯৩%
এরও বেশি মধ্যস্বত্বভোগীকে দিয়ে দিতে হয় । তাই তিনি দরিদ্র মহিলাদের কর্মসংস্থানের
সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেন । মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জনতা ব্যাংকের শাখায়
গিয়ে ম্যানেজারকে বললেন সুফিয়াদের মতো দরিদ্র কর্মীদের ঋণ দেওয়ার জন্য । ম্যানেজার
রাজি হলেন না । জামানত না থাকলে ঋণ দেওয়ার বিধান নেই । অন্য একটি শাখায় গিয়েও তিনি
একই কথা শুনলেন । এভাবে ছয় মাস ঘুরে নিজে গ্যারান্টার হয়ে জোবরা গ্রামে শুরু করলেন
কাজ । টাকা ঋণ নিল জোবরা গ্রামের মানুষ, আবার পরিশোধও করল । ব্যাংক বলল, এক গ্রামে
হয়েছে, দুই গ্রামে হবে না । কেউ বললেন পাঁচ গ্রামে হবে না । কিন্তু ইউনূস দমে যাওয়ার
পাত্র নন, তিনি এই ঋণ কার্যক্রম আশপাশের গ্রামেও শুরু করে দিলেন এবং সাফল্য পেলেন ।
গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা : ১৯৭৬ সালে ইউনূস তাঁর ক্ষুদ্র ঋণ ধারণাকে বাস্তবে রূপ দান করেন । জোবরা গ্রামের ক্ষুদ্রঋণ থেকেই ক্রমে ক্রমে ১৯৮৩ সালের ১ অক্টোবর ‘গ্রামীণ ব্যাংক’ নামে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হলো । ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রমাণ করলেন, ঋণ মানুষের মানবিক অধিকার । গরিবদের ঋণ পেতে হলে কোনো বন্ধকির দরকার হবে না । ব্যাংকই তাদের কাছে যাবে, ব্যাংকে তাদের আসতে হবে না । গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্য আজ দুনিয়াজোড়া আগ্রহের সৃষ্টি করেছে । যারা এই ব্যাংকের ঋণ পেয়েছে তাদের জীবনে এসেছে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন । আজ গ্রামীণ ব্যাংক একা গরিবদের যে পরিমাণ ঋণ দেয়, বাংলাদেশের সবগুলো জাতীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকও তার সমান ঋণ দিতে পারে না । যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য তাঁর শাসনামলে ড. ইউনূসকে যুক্তরাষ্ট্রে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে যান এবং তাঁর সুপারিশ শোনেন ।
নোবেল পুরস্কার : ২০০৬ সালের ১ অক্টোবর নরওয়ের নোবেল শান্তি কমিটি ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংককে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে । এই পুরস্কারের আর্থিক মূল্যমান ১৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার । অর্থাৎ ১৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা প্ৰায়।
ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক যা পেলেন : প্রথা অনুযায়ী রাজকীয় বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে নরওয়ের রাজধানী অসলোর সিটি হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে ১০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন ড. ইউনূস । নোবেল পুরস্কার হিসেবে ড. ইউনূস ও তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক পেয়েছিল নগদ ১ কোটি ক্রোনার বা ১০ লাখ ৭০ হাজার ইউরো বা ১৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা টাকার মূল্যমানে ৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা । তাছাড়াও পেয়েছেন একটি সোনার পদক ও একটি ডিপ্লোমা ।
ইউনূসের পুরস্কার : পৃথিবীর সবচেয়ে
বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার
আগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও ৬০টি পুরস্কার লাভ করেছেন । কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ
নানা সম্মানে ভূষিত ইউনূসের খ্যাতি আজ আকাশ ছোঁয়া । তাঁর আন্তর্জাতিকভাবে প্রাপ্ত
পুরস্কারের তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো :
রাষ্ট্রপতি পুরস্কার ১৯৭৮, বাংলাদেশ ব্যাংক
পুরস্কার ১৯৮৫, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ১৯৮৭, রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এ খান মেমোরিয়াল
গোল্ড মেডেল পুরস্কার ১৯৯৩, ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম গোল্ড মেডেল পুরস্কার ১৯৯৪, ঢাকা
মেট্রোপলিটান রোটারি ক্লাব ফাউন্ডেশন পুরস্কার ১৯৯৫, আইডিইবি স্বর্ণপদক ২০০২ এবং বাংলাদেশ
কম্পিউটার সোসাইটি স্বর্ণপদক ২০০৫ ।
এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ৭টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের ২টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন দেশের ১৩টিসহ মোট ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন ড. ইউনূস । বিশেষ সম্মানসূচক পদবি পান জাতিসংঘ ও ফ্রান্স থেকে । ২০০২ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক দেওয়া হয় International Goodwill Ambassador for UNAIDS. ২০০৪ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক তাকে প্রদান করেন সেদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘লিজিয়ান অব অনার’ । বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁকে সম্মানসূচক পদবিতেও ভূষিত করা হয় । সংগ্রহীত।

.jpg)
.jpg)
0 Comments